জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
উপন্যাস: শহীদুল জহির
পরিকল্পনা ও নির্দেশনা: সৈয়দ জামিল আহমেদ
উত্তর-আধুনিক লেখক শহীদুল জহির মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যাদু বাস্তবতায় নির্মাণ করেন উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনাময় রূপায়ণ নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ঘটমান বর্তমানের এক তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ যেখানে পরিবর্তনশীল ‘সত্য’ প্রতিরূপায়িত হয়েছে।
উপন্যাসের পটভূমি ১৯৮৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ১৪ বছর পর লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আবদুল মজিদ দেখে পুলিশ ক্লাবের কাছে মাইক্রোফোন হাতে আবুল খায়েরকে জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণরত অবস্থায়। একাত্তর সনে প্রথম যেদিন লক্ষ্মীবাজার এলাকায় মিলিটারী আসে সেদিন আবুল খায়েরের পিতা বদরউদ্দিন মাওলানার নির্দেশে একদিনে সাতজন মানুষ খুন হয় এবং তিনজন নারী শ্লীলতা হারায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় শেষ দিকে, যখন দেশ যেকোন মুহুর্তে মুক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল, ডিসেম্বরে আবদুল মজিদের বোন মোমেনাকে তুলে নিয়ে যায় বদু মাওলানার রাজাকার বাহিনী। মোমেনাকে আবদুল মজিদ চার দিন পর খুঁজে পায় রায়েরবাজারের পশ্চিম প্রান্তে, বুড়িগঙ্গা নদীর কিনারায় । মেয়ের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে আবদুল মজিদের মায়ের কান্না জমে গিয়েছিল। যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, বদু মাওলানা পালিয়ে যায়। কিন্তু দুই বৎসর পর ১৯৭৩ সালে সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করা হলে লক্ষ্মীবাজার ফিরে এবং মহল্লার লোকেরা তার গায়ে পুনরায় একাত্তরের সেই আলখাল্লা দেখতে পায়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকারী দলের স্থানীয় নেতা লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা আজিজ পাঠান, মুক্তিযুদ্ধের সময় যার বাড়ি মিলিটারির সহায়তায় লুট করে বদু মাওলানা, সেই আজিজ পাঠান বলেন, “আমার নেতা যেহেতু বদু মওলানাদের মাফ করছে, আমার নিজের কোন প্রতিহিংসা নাই। রাজনীতিতে চিরদিনের বন্ধু অথবা চিরদিনের শত্রু বলে কিছু তো নেই, কাজেই অতীত ভুলে যাওয়া ছাড়া আর কীইবা করার থাকে মানুষের।” ১৯৮৬ সালের গোড়ায় আবদুল মজিদ তার নবজাতক কন্যার মুখ দেখে তার নাম রাখে মোমেনা। একথা জানার পর, যে বদু মওলানা আবদুল মজিদের সঙ্গে অপ্রয়োজনে কথা বলে না, সে একদিন তাকে রাস্তায় থামিয়ে বলে, “বোনের নামে মেয়ের নাম রাখছো, বোনেরে ভুলো নাই!” বদু মওলানার কথা শুনে আবদুল মজিদের মনে হয়, বদু মওলানা জানে আবদুল মজিদরা একাত্তরের নয় মাসের কথা ভোলে নাই। এই অবস্থায় কয়েক দিনের চিন্তাভাবনার শেষে আবদুল মজিদ সিদ্ধান্ত নেয় মহল্লা ত্যাগ করে যাওয়ার ।